
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ২০২০ শেষ হলো। বাংলা ও বাঙালীর দুর্জয় আনন্দের দিন, অনন্য সাধারণ অর্জনের একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গর্জে উঠেছিলেন বাংলার শার্দূল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী আপামর জনসাধারণের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। ১০ লক্ষ জনতার সমুদ্রে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ” আর যদি একটা গুলি চলে তবে বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়াবে। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, বাংলার মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনসাআল্লাহ্।” সেদিনকার সেই বজ্রকঠিন ঘোষণাটি ছিল অলিখিত একটি ভাষণ। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করলো আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে যুব থেকে বৃদ্ধ সাধারণ থেকে প্রতিবন্ধি প্রতিটি ভোটার স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে সম্মান জানিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের গভীর আস্থা জ্ঞাপন করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানী জান্তা জনতার এ স্বতঃস্ফূর্ত রায় মেনে নিতে পারে নি। তারা ক্ষমতা বাংলার রাখাল রাজার হাতে ছেড়ে দিতে চায় নি। তাই মিটিং-এর নামে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করে যাচ্ছিল। পুর্ব পাকিস্তান তখন ছাই চাপা আগুনের মতো গনগন করছে। শেখ মুজিবের একটি নির্দেশের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহী জনগণ। অপরদিকে প্রতিপক্ষ আছে শেখ মুজিব একটি ভুল করবে, একটি ভুল নির্দেশনা দেবে প্রতীক্ষায়। তাহলেই দেশদ্রোহিতার অপরাধে জেল জুলুম নির্যাতন ও ফাঁসি দেয়ার রাস্তা অবারিত হয়ে যাবে। শেখ মুজিব তাঁর চিরদিনের সুখ দুঃখের সাথী বেগম মুজিবকে জিজ্ঞেস করলেন,” কি করবো আমি?” বেগম মুজিব বললেন,” তুমি সাহসী, বুদ্ধিমান। তোমার বিবেচনা বোধ জাগ্রত। তাই তুমি তোমার বুদ্ধিমত্তা দিয়েই কথা বলবে, নির্দেশনা দেবে।” সেদিনের সেই অলিখিত তাৎক্ষণিক ভাষণটি হয়ে গেল একটি কবিতা, একটি জাতির মুক্তির বারতা, একটি ঐতিহাসিক দলিল যা স্বীকৃতি পেলো ইউনেস্কোর প্রামাণিক দলিল হিসাবে।
১৯৭১ সালের এই দিনে আমি ছিলাম যশোর শহরের পুরাতন কসবা কাজী পাড়ায় আমার আব্বার মামা কাজি আয়নাল হকের বাড়ি। এই বাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করি। আমি যশোর সেবা সংঘ গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি তখন এস এস সি পরীক্ষার্থী। ২৪ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে পরীক্ষা। স্কুল আয়োজিত বিশেষ কোচিং ক্লাশ শেষ হয়েছে।
আমার জন্ম এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। অল্প বয়সে পিতৃহারা বাবা ২য় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আমার দাদা যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন আমার আব্বা মাত্র ১৪ বছরের। আমার আব্বা সবার বড়। তার ছোট আরও ৫টা ভাই বোন। তাদের দায়িত্ব এসে পড়লো আমার আব্বার ওপর। তিনি পড়ালেখা ছেড়ে চাকরি করতে গেলেন। যোগ দিলেন বৃটিশ সেনাবাহিনীতে। বৃটিশ সেনা হিসাবে তিনি ২য় বিশ্বযুদ্ধে তৎকালীন বার্মা মুলুকের রাজধানী রেঙ্গুনে অংশ নিলেন। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে যোগ দিয়েছিলেন সিভিল সাপ্লাইতে। এই সময় আমার মার সাথে তাঁর বিয়ে হয়।
আমার মাতৃহারা মা ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। দুজনেই সাহিত্যিক ছিলেন। দু’জনে দু’জনের কাছে সে কি লম্বা লম্বা চিঠি লিখতেন। লেখার ভাষা ছিল প্রাঞ্জল সুপাঠ্য সরল। মনে হয় সেদিন যদি চিঠিগুলো সংরক্ষণ করতাম, তাহলে হয়তো বা আজ সেগুলো সাহিত্যের মর্যাদা পেত। যাহোক বিয়ের ৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও আমার মার সন্তান হচ্ছিল না। ফলে একটা সন্তানের জন্য তাঁরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ১৯৫৪ সালে আমার আব্বা তখন কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে চাকরি করছেন। মাও আব্বার সাথে আছেন। যে বাসায় থাকতেন তার সামনেই ছিল মিশনারী হাসপাতাল। আমার মাকে পরীক্ষা করতে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখলেন তিনি সন্তান সম্ভবা, অর্থাৎ মায়ের গর্ভে আমার আগমন ঘটেছে। ১০ মাস ১০ দিন পর আমি ভুমিষ্ঠ হলাম।
আমি মেয়ে। সে সময় বাবা-মা মেয়ে সন্তানকে খুশি মনে গ্রহণ করতে পারত না। আমার সৌভাগ্য যে আমার মা বাবা আমাকে মেয়ে হিসাবে নয় সন্তান হিসাবে গ্রহণ করলেন। একজন ছেলেকে যে ভাবে আদর করা হয়, যত্ন করা হয়, ভালবাসা হয়, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা হয় ঠিক তেমনি ভাবেই আমার মুক্তচিন্তার আলোকিত বাবা-মা আমাকে আদর করলেন, যত্ন করলেন, ভালবাসলেন, আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলেন যে আমাকে লেখাপড়া শেখাবেন, ডাক্তার বানাবেন, সম্পদ ব্যক্তিতে পরিণত করবেন। আমি বড় হতে লাগলাম। আর দশটা সাধারণ মেয়ে যেমন পরিবার এবং সমাজের নিয়ম কানুনের বেড়াজালে বড় হয়, আমার আলোকিত পরিবার আমাকে তেমন কোন নিয়ম কানুন নিষেধের বেড়াজালে বদ্ধ করেননি। তাই আমি সত্যিই সৌভাগ্যবতী যে ছোট্টবেলা থেকে স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠেছি।
আমি আমার জীবনের এই ছোট্ট গল্পটি বললাম পাঠককে আমার বড় হওয়া, চিন্তার স্বাধীনতা, কাজের স্বাধীনতা কেমন ছিল তা জানাতে। এই জন্য সেই ছোট্ট বেলায় কিশোরী বয়সে রাজনীতিতে আমার প্রবেশ খুব সহজ ছিল। যদিও আমার আব্বার মামা অর্থাৎ আমার দাদা আমার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ পছন্দ করতেন না, তারপরেও আমি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করি। যখন আমি নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তখন যশোর জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জনাব রবিউল আলম আমাকে ছাত্রলীগের সদস্য করে নিলেন। আমি তখন পাকিস্তানীদের শোষণ বঞ্চনার কথা অত শত বুঝিনা। তবে নতুন কোন কাজ, মানুষকে সংগঠিত করা, সমাজসেবা এগুলো আমাকে খুব টানতো। রবিউল ভাই এবং সালেহা আপার সস্নেহ আচরণ আমার ভাল লাগতো, তাই তাদের সাথে বিভিন্ন মিছিল মিটিং-এ অংশ নিতাম। এভাবে কাজ করতে করতে কখন যেন একজন সক্রিয় কর্মী হয়ে গেলাম বুঝতে পারিনি। ১৯৬৯ এর গণ আন্দোলন, ৭০-এর উড়িরচরে ঝড়ে ভুক্তভোগীদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ, নির্বাচনে প্রচারণা, নির্বাচনের দিন আমাদের আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জনাব আতর আলীর পোলিং এজেন্ট হিসাবে কাজ করা, নির্বাচন পরবর্তী বিজয়ী প্রার্থী পক্ষে বিজয় মিছিলে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কাজগুলো স্বতঃস্ফুর্তভাবে করতাম।
সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। আমাদের সকলের সে কি উচ্ছাস। আমরা জিতেছি। এবার পাকিস্তানের সামরিক শাসক পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্ব শাসন দেবে। সারা দেশের মতো যশোর শহরেও মিটিং মিছিল পিকেটিং চলছে। আমিও সেসব মিটিং মিছিল পিকেটিং-এ অংশ নিচ্ছি। পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য গড়িমসি করছে। আর পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি জনগণ ফুঁসে উঠছে। শেখ মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। তিনি হয়ে গেলেন পূর্ব পাকিস্তানের অঘোষিত রাজা। তিনি বলছেন গাড়ির চাকা ঘুরবে না, গাড়ির চাকা ঘুরছে না। তিনি বলছেন অফিস আদালত খুলবে না। অফিস আদালত খুলছে না। রাজপথ জনপথ চায়ের দোকানে, ঘরে ঘরে, হাটে বাজারে সব জায়গায় একই আলোচনা, একই উৎকণ্ঠা, কি হবে দেশের! ইয়াহিয়া কি ক্ষমতা হস্তান্তর করবে! ইয়াহিয়া যদি ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তাহলে সশস্ত্র যুদ্ধের বিকল্প নেই। ছাত্রলীগের কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলো সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার। তার জন্য প্রয়োজন বন্দুক চালনা শেখা। যশোরে চিরুণী কল চত্ত্বরে খুবই গোপনে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ শুরু হলো। সেই প্রশিক্ষণে মমতাজ আপা, সালেহা আপা, সাথী আপা সহ অন্যদের সাথে আমিও অংশ নিলাম। আমার দাদা অর্থাৎ আব্বার মামা কাজি আয়নাল হক আমার প্রতিদিনের মিটিং মিছিল হরতাল অবরোধে অংশ নেয়া একদম পছন্দ করছেন না। আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন গ্রামের বাড়ি যেয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। আমিও গ্রামের বাড়িতে যাব যাব করছি, কিন্তু যেতে মন চাইছে না।
ইতোমধ্যে ৩রা মার্চ সকাল থেকে মিছিল হচ্ছে। একটা মিছিল যশোর চৌরাস্তা থেকে শুরু হয়ে রেল রোড হয়ে টেলিফোন ভবনের সামনে দিয়ে প্রদক্ষিণ করছিল। অপর একটি মিছিল এম এম কলেজ থেকে বের হয়ে এসপি অফিস পুলিশ ব্যারাকের সামনে দিয়ে গরীব পীর সাহেবের মাজার হয়ে কালেক্টরেট ভবনের সামনে দিয়ে দড়াটানার দিকে যাচ্ছিল। অন্য আর একটি রাস্তায় অপর একটি মিছিল বের হয়েছে। যশোর শহর যেন মিছিলের শহরে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে সংবাদ এলো টেলিফোন ভবনের সামনে গুলি হয়েছে। একজন নারী মারা গেছেন। এ খবরে সকলে আরও বেশি মারমুখি হয়ে উঠলো। জোরেসোরে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি শুরু হলো। এর মধ্যে ঘোষণা হলো ৭ই মার্চ রমনা রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন।
আমাদের অনেকেই এই ভাষণ শুনতে ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু আমি ছোট মানুষ। আমার ঢাকা যাওয়ার সাহস নেই, সঙ্গীও নেই। বাড়ি থেকে অনুমতি দেবে না। অগত্যা যশোর বসেই ভাষণ শুনবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন তো এখনকার মতো এত টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না। বাড়ি বাড়ি টেলিভিশনও ছিল না। রেডিও-র ওপরেই বেশি ভরসা। ৭ তারিখ সকালে শোনা গেল, মুজিবের ভাষণ রেডিও টিলিভিশনে সম্প্রচার করা হবে না। আমরা সকলে হতাশ হয়ে পড়লাম। সেদিন আমরা সরাসরি শেখ মুজিবের ভাষণ শুনতে পাইনি। বাংলাদেশের মানুষের চাপে নতি শিকার করে পরদিন অর্থাৎ ৮ই মার্চ সেই ভাষণ রেডিও এবং টেলিভিশনে সম্প্রচার হলো। তখন আমরা সেই ভাষণ শুনলাম। ভাষণ শোনা শেষে আমার দাদা আমাকে আর যশোর শহরে থাকতে দিলেন না। আমি গ্রামের বাড়িতে আমার মা বাবার কাছে চলে গেলাম।





